GLOBAL NETWORK OF BANGLADESHI BIOTECHNOLOGISTS

NEWS

Story of a successful scientist, GNOBB moderator Prof. Ahmad Shamsul Islam

Story of a successful scientist, GNOBB moderator Prof. Ahmad Shamsul Islam

ড. আহমদ শামসুল ইসলাম ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উদ্ভিদবিজ্ঞান বিভাগে ‘পিএইচডি’ চালু করেছেন, ‘প্লান্ট টিস্যু কালচার ল্যাবরেটরি’ গড়ে তুলেছেন। ‘বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব প্লান্ট টিস্যু কালচার অ্যান্ড বায়োটেকনোলজি (বিএপিটিসিবি)’ও তাঁর হাতেই শুরু। এ বিভাগের গবেষণা জার্নাল ও ঢাকা ইউনিভার্সিটি স্টাডিজের সম্পাদক ড. আহমদ শামসুল ইসলামই পাটের দুটি জাত তোষা ও দেশির মধ্যে সংকরায়ণ করেছেন। ৯৩ বছরের এই শিক্ষাবিদ ও গবেষকের মুখোমুখি হয়েছেন ওমর শাহেদ। ছবি তুলেছেন কাকলী প্রধান।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে যোগ দিলেন কিভাবে?
তখন তো ভারতবর্ষ অবিভক্ত ছিল। আমরা পশ্চিমবঙ্গের মেদিনীপুরে থাকতাম।

নানা খোদা নেওয়াজ মোক্তার ছিলেন। খুব নামকরা উকিল ছিলেন। ওকালতি করে অনেক টাকা-পয়সা উপার্জন করেছিলেন। তাঁর ছোট ভাই আবু হেনাকে অনেকেই চেনেন। তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগের অধ্যাপক ছিলেন। পরে ট্রেজারার হয়েছেন। তাঁরা আমাকে লেখাপড়ায় খুব অনুপ্রাণিত করতেন। খালু পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য সরকারের সচিবালয় ‘রাইটার্স বিল্ডিং’-এ কাজ করতেন। প্রেসিডেনসি কলেজ থেকে উদ্ভিদবিজ্ঞানে বিএসসি অনার্স করার পর খালু বললেন, ‘অনার্স পাস করে ফেলেছ, আর লেখাপড়ার কী দরকার? সচিবালয়ে যোগদান করো। উপসচিব, যুগ্ম সচিবও হতে পারবে। ’ তবে আমার মা খাদিজাতুল কোবরার খুব ইচ্ছা, ছেলে-মেয়েদের লেখাপড়া করাবেন। তিনি বললেন, ‘ওসব হবে না। আমাকে যদি উপোস করতে হয় তাও ভালো, তুমি এমএসসি করো। ’ এমএসসিতে ভর্তি হলাম। ফলাফল ভালো-খারাপ কোনোটাই হলো না। দ্বিতীয় শ্রেণিতে প্রথম হলাম। আমার এমএসসির বছরেই দেশভাগ হলো। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বেশির ভাগ হিন্দু শিক্ষক ভারতে চলে গেলেন। বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষক সংকট দেখা দিল। আমরা ধাকায়   চলে এলাম। শিক্ষকের এত অভাব ছিল যে যেদিনই ঢাকায়  এলাম, সেদিনই চাকরি হয়ে গেল। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উদ্ভিদবিজ্ঞান বিভাগের প্রতিষ্ঠাতা বিখ্যাত অধ্যাপক পি. মহেশ্বরী ১৯৪৮ সালের মার্চে আমাকে নিয়োগ দিয়ে বললেন, ‘অধ্যাপকদের শুধু পড়ালেই হবে না, গবেষণাও করতে হবে। গবেষণাও শুরু করে দাও। ’ বেতন ধার্য হলো ১৫০ টাকা। মহার্ঘ ভাতা ৩০। তখনকার আমলে যেকোনো মধ্যবিত্ত পরিবারের জন্য এ অনেক টাকা।  

তখনকার পরিবেশ?
যদিও তাঁর কাজই করতাম, তিনি এত ভদ্র, বিনয়ী ও শিষ্টাচারসম্পন্ন মানুষ ছিলেন—সে গুলো আমার নামেই প্রকাশ করতেন। স্লাইডগুলো তো তাঁরই তৈরি ছিল। আমি শুধু পরীক্ষা করতাম। শিক্ষকতায় যোগদানের পরপরই আতা ফল নিয়ে গবেষণা শুরু করলাম। তবে গবেষণা শেষে গাছে ফুল হলো না, ফল হলো। গবেষণার ফলাফলের ভিত্তিতে আতা ফলের যে উন্নত জাতটি বের করেছিলাম, সেই প্রবন্ধটি ১৯৫৪ সালে বিখ্যাত ‘নেচার’ জার্নালে ছাপা হলো। তখনো কিন্তু আমার পিএইচডি হয়নি। তখন সংখ্যা নয়, মানের বিচারে ছাত্র-ছাত্রী ভর্তি করা হতো, আমাদের ছাত্র-ছাত্রী ছিল মোটে ছয়জন। আমরা চার-পাঁচজন শিক্ষক। শিক্ষক সংকটের ফলে সব সময় ক্লাস নিতে হতো। তত্কালীন শিক্ষামন্ত্রীর কাছে মহেশ্বরী স্যার উদ্ভিদবিজ্ঞান বিভাগে এমএসসি খোলার অনুমতি চাইলে তিনি জিজ্ঞাসা করলেন, ‘আপনি কতজন ছাত্র নেবেন? স্যার উত্তর দিলেন—‘ছয়জন। ’ শিক্ষামন্ত্রী হেসেই উড়িয়ে দিলেন, ‘ছয় ছাত্রের জন্য আপনাদের যন্ত্রপাতি, অণুবীক্ষণ যন্ত্র ইত্যাদি কেনার জন্য এত টাকা তো দিতে পারব না। ’ এর পরও স্যারের অনুরোধে এমএসসি চালু হলো। এখন তো এই বিভাগে অনেক কিছু আছে। প্রথমে বিভাগটির নাম ছিল ‘জীববিদ্যা’। ১৯৫৪ সালে দুটি আলাদা বিভাগের জন্ম হলো—‘উদ্ভিদবিজ্ঞান’ ও ‘প্রাণিবিদ্যা’। 

সেই জীবনের আর কোনো স্মৃতি?
তখন যেকোনো অনুষ্ঠান, সামাজিক উদ্যোগে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের দাওয়াত করা হতো। আমিও যেতাম। এক দাওয়াতে গিয়ে সামনের সারিটি ফাঁকা দেখে আমি ও এক সহকর্মী গিয়ে বসলাম। আয়োজকরা বয়স কম দেখে আমাদের পেছনের সারিতে গিয়ে বসতে বললেন। ফলে খুব রাগ হলো। বললাম, ‘গায়ে কী লেভেল লাগিয়ে আনব যে আমরা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক?’ তাঁরা ক্ষমা চাইলেন। পুরনো ঢাকার গেণ্ডারিয়ায় মা, ভাই-বোনদের নিয়ে ভাড়া বাড়িতে থাকতাম। আবদুল বাতেন আমার ছাত্র ছিল। পরে সে মন্ত্রী হয়েছে, মারা গেছে। সে আমার সঙ্গে এমএসসির গবেষণা শুরু করল। তাকে বললাম, ‘গেণ্ডারিয়ায় থেকে তোমাকে গাইড করা খুব কঠিন হবে। ’ সে তার চাচা আবদুল হাদী তালুকদারকে বলল। তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রেজিস্ট্রার ছিলেন। খুব নামকরা লোক। তিনি বিভাগের কাছে একটি পুরনো বাড়ি ঠিক করে দিলেন। সেগুলো এখন আর নেই, শিক্ষকদের বহুতল ভবন হয়েছে। এক বাসায় মা, ভাই-বোনকে নিয়ে থাকতাম। পার্টিশন দিয়ে অন্য অংশে উর্দুর এক অধ্যাপক থাকতেন। আরবি বিভাগের অধ্যাপক মোয়াজ্জেম হোসেন তখন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য। অর্থনীতির অধ্যাপক আয়ার, উর্দুর আন্দালিব সাদানীর মতো বিখ্যাত শিক্ষকরা তখন এখানে শিক্ষকতা করতেন। 

পিএইচডি করলেন কিভাবে?       
তখন অনেকেই পিএইচডির জন্য আবেদন করছিলেন। আমিও করলাম। সৌভাগ্যবশত ব্রিটিশ কাউন্সিলের স্কলারশিপ পেয়ে গেলাম। বাংলাদেশে আমি প্রথম ব্রিটিশ কাউন্সিল স্কলার। সে জন্য কিছুদিন আগে তাঁরা আমাকে সম্মানিত করেছেন। শিক্ষাবৃত্তি পাওয়ার পর বিশ্ববিদ্যালয় বলল, পিএইচডির জন্য বিদেশে গেলে অর্ধেক বেতন দিতে পারি। ফিরে এসে সে টাকা পরিশোধ করতে হবে। ব্রিটেনের ম্যানচেস্টার ইউনিভার্সিটিতে চলে গেলাম। পরিবারের অন্যরা আমার বেতনের টাকায় বিশ্ববিদ্যালয়ের কোয়ার্টারে বাস করত। সে আমলে পিএইচডিতে ভর্তি হওয়া খুব কঠিন ছিল। তাঁরা ছাত্রদের বাজিয়ে দেখতেন। আমার সুপারভাইজারের নাম এ সি হারল্যাম। তাঁর সঙ্গে দেখা করার পর বললেন, ‘স্ট্রবেরির ওপর পড়ালেখা করো। এক মাস পর আলাপ হবে। ’ কথাটি শোনার সঙ্গে সঙ্গে মাথায় হাত দিয়ে বসে পড়লাম। কারণ এ তো বিরাট গবেষণাক্ষেত্র। কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের এক বছরের সিনিয়র এক পিএইচডি ছাত্রকে ব্যাপারটি বলার পর পরামর্শ দিলেন, ‘কোনো চিন্তা করো না। তিনি আমাকেও একই কথা বলেছিলেন। মাসখানেক স্ট্রবেরির ওপর পড়ালেখা করো। এরপর নিজেই বুঝতে পারবে, কোন সমস্যা নিয়ে কাজ করা যেতে পারে। ’ মাসখানেক পড়ালেখার পর হারল্যামের সঙ্গে দেখা করলাম। আমার কথা শুনে তিনি খুব মুগ্ধ, ‘কাজ শুরু করো। ’ ‘জেনেটিকস অব স্ট্রবেরি’ নিয়ে গবেষণা শুরু করলাম। কিভাবে স্ট্রবেরির বীজ কম রেখে ফলের আকার উন্নত করা যায়, গন্ধ ছড়ায় সেসব নিয়ে কাজ করেছি। তবে আমার মূল গবেষণা ছিল, মেন্ডেলের সূত্র নিয়ে। তাঁকে ‘ফাদার অব জেনেটিকস’ বলা হয়। তিনি সূত্র দিয়েছিলেন, দুটি ফলের সংকরায়ণে প্রথমবার মাঝামাঝি বৈশিষ্ট্যের ফলাফল পাওয়া যাবে। তারপর থেকে আলাদা বৈশিষ্ট্যের ফল পাওয়া যাবে। সেখানে চার ভাগের তিন ভাগ বৈশিষ্ট্য হবে বাবার, এক ভাগ মায়ের। যেমন চ্যাপ্টা আলুর সঙ্গে গোল আলুর সংকরায়ণে মাঝামাঝি ফল দেবে। পরের প্রজন্মে চার ভাগের তিন ভাগ গোল আলু, এক ভাগ চ্যাপ্টা আলুর বৈশিষ্ট্য হবে। এক বিখ্যাত বংশগতিবিদ তাঁর এ সূত্রটি ঠিক নয় বলে দাবি করেছিলেন। আমি প্রমাণ করে দিলাম, মেন্ডেলই সঠিক সূত্র দিয়েছেন। পিএইচডির মান খুব ভালো হওয়ায় আমাকে ‘কারি মেমোরিয়াল প্রাইজ’ দেওয়া হলো। সেখান থেকে জাপানের টোকিও ইউনিভার্সিটিতে গিয়ে ছয় মাসে প্লান্ট টিস্যু কালচার ল্যাবরেটরি স্থাপন করেছি। 

বাংলাদেশে ফেরার পর কী হলো?
১৯৫৪ সালে সাড়ে তিন বছরের পিএইচডি শেষে দেশে ফিরে এলাম। বৃত্তি থেকে যে টাকা পেয়েছিলাম, সেটি সংসার চালানোর জন্য যথেষ্ট ছিল না। তাই বিশ্ববিদ্যালয়ের কাছ থেকে আট হাজার টাকা ধার নিয়েছিলাম। সে টাকায় মা ও ভাই-বোনেরা চলত। ফিরে এসে বললাম, বিদেশে তো থাকিনি, দেশে ফিরেছি। টাকা মাফ করে দেওয়া হোক। তবে তাঁরা রাজি নন। হিংসাবশত মিটিং করে উল্টো বললেন, তোমাকে তো সুবিধা দেওয়া হয়েছিল। টাকা ফেরত না দিয়ে মাফ চাইছ কেন? ৮ শতাংশ হারে সুদসহ টাকা ফেরত দিতে হবে। এত ঋণের বোঝা বইতে পারব না বলে চাকরি খুঁজতে শুরু করলাম। 

এ জন্যই কী সিন্ধু বিশ্ববিদ্যালয়ে যোগ দিলেন?
পাকিস্তানের ডন পত্রিকায় সিন্ধু বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যাপক পদে বিজ্ঞপ্তি দেখে আবেদন করলাম। সিন্ধু প্রদেশে বিশ্ববিদ্যালয়টি সবে চালু হয়েছে। করাচির পর এটি তাদের দ্বিতীয় বিশ্ববিদ্যালয়। শুরুতে হায়দরাবাদে ছিল। ১৯৫৪ সালে মাত্র ৩২ বছর বয়সে অধ্যাপক হিসেবে ১৫০ রুপি মূল বেতন ও ৩০ রুপি মহার্ঘ ভাতায় যোগ দিলাম। গিয়ে দেখি, বিরাট এক হাই স্কুলে বিশ্ববিদ্যালয় শুরু হয়েছে। বিজ্ঞানের কোনো বিভাগ নেই। সিন্ধু ভাষায় অর্থনীতিসহ মানবিকের কয়টি মাত্র বিভাগ চালু আছে। স্কুলের বিরাট ক্লাসরুমে আমাদের খাটিয়া পেতে দেওয়া হলো। টয়লেটও নেই। যোগদানের পর ফারুকী নামে এক সিনিয়র প্রফেসর বললেন, ‘উদ্ভিদবিজ্ঞান ও প্রাণিবিদ্যা বিভাগ দুটি চালু করুন। ’ ভাড়া বাড়িতে অর্ধেক অর্ধেক ভাগ করে নিয়ে বিভাগ দুটি চালু করলাম। উদ্ভিদবিজ্ঞানের সিলেবাস তৈরি করলাম। সিন্ধিরা আমাকে মোটেও হিংসা করত না। তবে অন্যান্য প্রদেশের, বিশেষত ভারতের উত্তর প্রদেশ থেকে আসা শিক্ষকরা খুব হিংসা করতে লাগলেন। তাঁদের প্রচণ্ড প্রপাগান্ডায় প্রথম বছর ছাত্র-ছাত্রীই ভর্তি হলো না। বুদ্ধি করে ‘প্ল্যান্ট ব্রিডিং’ বা ‘উদ্ভিদপ্রজনন’ নামে এমএসসি কোর্স চালু করলাম। কোনো ক্লাস হবে না, গবেষণা হবে। ছয় ছাত্র-ছাত্রী পেলাম। তাদের ইংরেজিতে পড়ানো শুরু করলাম। বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য, ‘ব্রিটিশ পোয়েটিক সোসাইটি’র ভাইস প্রেসিডেন্ট আল্লামা আই আই কাজী আমাকে খুব পছন্দ করতেন। তিনি গবেষণাগার তৈরির অনুমতি দিলেন। নতুন ভবনের বেজমেন্টে চারাগাছ রাখা শুরু করলাম। বিরাট গামলায় পানি রেখে ফ্যান চালিয়ে পরিবেশটাকে ঠাণ্ডা করা হতো। গরম লাগলে স্ত্রীকে নিয়ে এসে আমরাও শীতল হতাম। সবচেয়ে ভালো অণুবীক্ষণ যন্ত্র প্রস্তুতকারক জার্মান কম্পানি জাইসের তৈরি জাইস, লাইকা অণুবীক্ষণ যন্ত্র দিয়ে আমার শিক্ষার্থীরা গবেষণা করত। বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে আন্দোলনের ফলে পাকিস্তান সরকার বিচলিত হয়ে একবার সিন্ডিকেট মেম্বার নেওয়া বন্ধ করে দিল। পরে শিক্ষকদের আন্দোলনে একজন করে সদস্য নিতে রাজি হলো। বাঙালি হিসেবে আমার সে পদে নির্বাচিত হওয়ার কোনো সম্ভাবনা ছিল না। তবে তাদের মধ্যে প্রচণ্ড বিরোধের কারণে সিন্ডিকেট মেম্বারও নির্বাচিত হয়েছিলাম। 

সেখানে আর কী কী উদ্যোগ নিয়েছিলেন?
এমএসসি পাসের পর ছাত্র-ছাত্রীদের বললাম, ‘তোমরা পিএইচডি করতে চাইলে চালু করতে পারি। ’ তারা খুব উত্সাহিত হলো। তবে মা-বাবাকে বলার পর তাঁরা বেঁকে বসলেন। বললেন, ওসব কিছুই হবে না। বোরকা পরে তোমরা বিশ্ববিদ্যালয়ে যাবে। ভেতরে গিয়ে বোরকা খুলে ছেলে-মেয়ে একসঙ্গে বসে গালগল্প করবে। শুনে বললাম, ‘আমাকে না জানিয়ে তোমাদের মা-বাবাকে একদিন নিয়ে আসো। তাঁরা গবেষণাগার ঘুরে দেখুক। সন্তুষ্ট হলে পিএইচডি চালু হবে। না হলে নয়। ’ তাঁরা যেদিন এলেন, সৌভাগ্যবশত আমরা সবাই খুব ব্যস্ত ছিলাম। গবেষণাগার ও পরিবেশ দেখে তাঁরা রাজি হলেন। পিএইচডি চালু হলো। প্রথম ব্যাচে চারজন পিএইচডি পেয়েছিল। তাদের মধ্যে শিক্ষা কার্যক্রম বিনিময় চুক্তির আওতায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উদ্ভিদবিজ্ঞান বিভাগের সাবেক অধ্যাপক মোজাম্মেল হকও ছিল। মরুভূমিতে তো গাছ জন্মে না। তবে ‘নিম’ হয়। পুরো ক্যাম্পাস নিমে ভরে ফেলেছিলাম। পানির ট্যাংকি এনে চারাগাছে পানি ঢালা হতো। বহু বছর পর পেশোয়ারে একটি বৈজ্ঞানিক সম্মেলনে আমাকে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছিল। পেশোয়ার থেকে করাচি এসে ঢাকার বিমানের জন্য অপেক্ষা করছি। হঠাত্ এক ভদ্রলোককে দেখে চেনা চেনা লাগল। কাছে গিয়ে পরিচয় দিলাম। তিনি অবাক হয়ে গেলেন। এরপর খুব খাতির করা শুরু করলেন। তিনি অন্য কোথাও যাচ্ছিলেন। সেসব ভুলে বললেন, ‘আমার সঙ্গে গাড়ি আছে। আপনাকে ক্যাম্পাস ঘুরিয়ে দেখাতে চাই। নিজের চোখে উন্নতি দেখবেন। ’ সরকারের কাছ থেকে অনেক জমি পেয়ে তখন বিশ্ববিদ্যালয়ের বিরাট ক্যাম্পাস হয়েছে। গিয়ে দেখি, অনেক গাছগাছালিতে ভর্তি। এসব আমারই বোনা—ভাবতেই মনটা ভরে গেল। পরে জানলাম, তিনি কোথাও ভর্তি হতে পারছিলেন না। আমি তাঁকে প্রাণিবিদ্যা বিভাগে ভর্তি করেছিলাম। তিনি তা মনে রেখেছেন। 

‘পাকিস্তান সায়েন্স স্টাডিজ’ কিভাবে শুরু করলেন?
সিন্ধু বিশ্ববিদ্যালয়ে যোগদানের পরপরই এটি প্রকাশের উদ্যোগ নিলাম। সব বিভাগের অধ্যাপককে লেখার আমন্ত্রণ জানালাম। এ-ও বললাম, ‘আপনাদের আর্টিকেলগুলো অভিজ্ঞদের মাধ্যমে মূল্যায়নের পরই শুধু ছাপা হবে। ’ ফলে অনেকে আমার ওপর অসন্তুষ্ট হলেন। বিশ্ববিদ্যালয়টি থেকে আগে যে জার্নালটি প্রকাশিত হতো, সেখানে মূল্যায়ন ছাড়াই লেখা ছাপা হতো। সেটি বন্ধ করলাম। আর্টিকেল এলো। সেগুলো ছাপা হলো। প্রাণিবিদ্যা বিভাগের এক অধ্যাপকের আর্টিকেল ছাপানো গেল না বলে তিনি খুব খেপে গেলেন। বললেন, তাঁকে অগ্রাহ্য করা হয়েছে। উত্তরে বললাম, ‘যেকোনো আর্টিকেলের সঙ্গে ইলাস্ট্রেশন থাকে। আপনার লেখাটির সঙ্গে নেই—এটি লেখাটির দুর্বলতা হতে পারে। ’ ১৯৭০ সালে দেশে ফিরে আসার আগ পর্যন্ত বছর দশেক এই জার্নালের প্রতিষ্ঠাতা সম্পাদক ছিলাম। এটি এখনো আছে। পূর্ব ও পশ্চিম পাকিস্তানের উদ্ভিদবিজ্ঞানীদের বৈজ্ঞানিক গবেষণা প্রবন্ধ প্রকাশের জন্য তখন ‘পাকিস্তান জার্নাল অব বোটানি’ প্রকাশ করতাম। বাঙালিদের সঙ্গে ওদের বিরোধ তুমুল আকার ধারণ করলে সে চাকরি ছেড়ে ১৯৭০ সালে নিজের দেশে ফিরে এলাম। 

এরপর তো ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে যোগ দিলেন?
ঢাকায় ফিরে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যাপক হিসেবে আবেদন করলাম। তখন অধ্যাপক পদে অনেক নিয়োগ হচ্ছিল। বিশ্ববিদ্যালয়ের ট্রেজারারের সঙ্গে আমার শ্বশুরের খুব বন্ধুত্ব ছিল। তিনি একদিন আমাকে তাঁর সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিতে নিয়ে গেলেন। ট্রেজারার নিয়োগ কমিটির সেক্রেটারি ছিলেন। তিনি পরিচয়ের পর বললেন, ‘আপনার ফাইলও আমার কাছে আছে। আবেদনপত্রটি একটু দেখে আসি। ’ কিছুক্ষণ পর ফিরে শ্বশুরকে বললেন, ‘আপনার জামাইয়ের তো কোনো সম্ভাবনা নেই। ’ শ্বশুর তো অবাক, ‘কেন? সে তো অধ্যাপক হিসেবে অনেক দিন কাজ করেছে। ’ বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক হিসেবে নিয়োগের ক্ষেত্রে শিক্ষকতার অভিজ্ঞতা, গবেষণা ইত্যাদি বিষয়ে আলাদা আলাদা নম্বর থাকে। যাঁর যত অভিজ্ঞতা, তাঁর নম্বর তত বেশি হয়। আমার আবেদনপত্রের গবেষণার ঘরে ‘শূন্য’ লেখা ছিল। তিনি সেটি বলার পর আমি তো অবাক। কারণ তত দিনে আমার ৫০টির বেশি গবেষণা প্রবন্ধ নেচার, হেরিডিটিসহ নানা জার্নালে প্রকাশিত হয়েছে। তিনি বুদ্ধি দিলেন, ‘আপনি উপাচার্যের সঙ্গে দেখা করে সব খুলে বলুন। ’ সহযোগী অধ্যাপক পদ পর্যন্ত সাক্ষাত্কারে নিয়োগ দেওয়া হয়, তবে অধ্যাপক পদে সাক্ষাত্কার হয় না। উপাচার্য এই পদে নিয়োগ দান করেন। অধ্যাপক আবু সাঈদ চৌধুরী সব শুনে বললেন, ‘তোমার সঙ্গে যারা প্রতিযোগিতা করছে, এ নিশ্চয়ই তাদের কাজ। ’ তিনি আমার সামনেই রেজিস্ট্রারকে ফোন করে বললেন, ‘আপনি নিজে দেখেছেন?’ রেজিস্ট্রার হতভম্ব হয়ে গেলেন। তিনি বললেন, ‘এর পর থেকে প্রতিটি অধ্যাপকের বায়োডাটা আপনি নিজে চেক করে নেবেন। ’ বুঝলাম, আমার নিয়োগ হয়ে যাবে। ১৯৭০ সালে অধ্যাপক হিসেবে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে যোগ দিলাম। 

উদ্ভিদবিজ্ঞান বিভাগের উন্নয়নে আপনার অবদান?
যোগদানের পর দেখলাম, অন্য বিভাগগুলোতে পিএইচডি দেওয়া হয়; কিন্তু উদ্ভিদবিজ্ঞানে কোনো পিএইচডি দেওয়া হয় না। পিএইচডি প্রগ্রাম চালু করলাম। প্রথম ছাত্রটি পাট গবেষণায় পিএইচডি করল। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে থাকার সময় আমার অধীনে ২০ জন ছাত্র-ছাত্রী পিএইচডি করেছে। এই বিভাগের মাধ্যমে বাংলাদেশের কোনো বিশ্ববিদ্যালয়ে আমি ‘প্লান্ট টিস্যু কালচার ল্যাবরেটরি’ চালু করেছি। এই গবেষণাগারের জন্য আমাদের প্রথম চাহিদা ছিল একটি এসি। কারণ গবেষণাগারের তাপমাত্রা ২০ ডিগ্রি সেলসিয়াসে নামিয়ে আনতে হবে। তবে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এসি কেনার টাকা জোগাড় করে দিতে পারল না। ব্রিটিশ কাউন্সিলের সঙ্গে সম্পর্ক ভালো বলে তাদের কাছে চাইলাম। তারা বলল, ‘আপনাকে নতুন এসির টাকা দিতে পারব না। তবে আমাদের অফিসের পুরনো এসিগুলো চাইলে নিতে পারেন। আমরা নতুন এসি আনছি। ’ আমরা একটি ফ্ল্যাক্সে অর্কিডের গবেষণা শুরু করলাম। আমাদের এই গবেষণাগারে গবেষণার মাধ্যমে একটি থেকে হাজার হাজার গাছের জন্ম হলো। বাংলাদেশে আমার হাত ধরেই প্লান্ট টিস্যু কালচার গবেষণার সূত্রপাত হয়েছে। এরপর বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে এই গবেষণাগার স্থাপিত হয়েছে। চট্টগ্রাম, খুলনা, সিলেটসহ নানা বিশ্ববিদ্যালয়ে এ বিষয়ে ছাত্র-শিক্ষকরা গবেষণা করছেন। আমি এই বিভাগের ‘হেড অব দ্য ডিপার্টমেন্ট’ও ছিলাম। 

এ বিষয়ে একটি সংগঠনও তো আপনি গড়েছেন?
‘বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব প্লান্ট টিস্যু কালচার অ্যান্ড বায়োটেকনোলজি (বিএপিটিসিবি)’ নামে একটি সংগঠন তৈরি করেছি। এটি এখনো আছে, আমাদের ওয়েবসাইটও রয়েছে। এটি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উদ্ভিদবিজ্ঞান বিভাগ পরিচালনা করে। তিন বছর পর পর এই ক্ষেত্রের বিশ্বের নামকরা লোকদের আমন্ত্রণ জানিয়ে আমরা বৈজ্ঞানিক সম্মেলন করি। এবারের সম্মেলনটি ডিসেম্বরে হবে। শরীর ভালো থাকলে যাব। আমি এই সংগঠনের প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি। এখন সদস্য হিসেবে আছি। আমাদের ‘জার্নাল অব প্লান্ট টিস্যু কালচার অ্যান্ড বায়োটেকনোলজি’ নামে একটি জার্নালও আছে। এক যুগ আগে ‘গ্লোবাল নেটওয়ার্ক অব বাংলাদেশ বায়োটেকনোলজিস্ট (জিএনওবিবি)’ নামে একটি নেটওয়ার্ক গড়ে তুলেছি। বিভিন্ন দেশে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকা এ দেশের বায়োটেকনোলজিস্টরা যেসব গবেষণা করেন, সেই প্রবন্ধগুলো এখানে ছাপা হয়, তাঁদের নিয়ে সংবাদ প্রকাশিত হয়। 

উদ্ভিদবিজ্ঞান বিভাগের জার্নালটিও তো আপনার হাতেই শুরু হয়েছে?
আমার লক্ষ্য ছিল, গবেষকদের গবেষণাগুলো প্রকাশ করব। বিদেশের জার্নালগুলোতে সাধারণত আমাদের গবেষকদের লেখা ছাপাতে চায় না। তারা মনে করে—সেগুলোর মান ভালো নয়। সে জন্য সবাইকে অনুরোধ করে এই জার্নালটি করেছিলাম। নিয়ম হলো, বছরে অন্তত দুটি জার্নাল প্রকাশ করতে হবে। তবে উদ্ভিদবিজ্ঞান বিভাগ থেকে এখন বছরে চারটি জার্নাল প্রকাশিত হচ্ছে। এটির নাম ‘বাংলাদেশ জার্নাল অব বোটানি’। এখনো আমার ছাত্র-ছাত্রীরা স্বীকার করে যে তাদের অনেককে আমি শিক্ষকতা ও গবেষণায় অনুপ্রাণিত করেছি। এ নিয়েও অনেক ঘটনা আছে। যেমন আমার চারজন ছাত্র পাট নিয়ে গবেষণা করত। তাদের খুব শখ ছিল, পিএইচডি করবে। তবে বিভাগের তত্কালীন প্রধান অনুমতি দিচ্ছিলেন না। তখন ওদের পরামর্শ দিলাম, তাঁকে আমার সঙ্গে তোমাদের পিএইচডির জয়েন্ট সুপারভাইজার হওয়ার অনুরোধ জানাও। পরে তিনি অনুমতি দিলেন। তারা পিএইচডি সম্পন্ন করতে পেরেছিল। এখন যারা এখানে শিক্ষকতায় আছে, তারা আমার ছাত্র বা ছাত্রের ছাত্র। ১৯৯০ সালে অবসর নিয়েছি। 

মাঝখানে তো দারুস সালাম বিশ্ববিদ্যালয়েও অধ্যাপনা করেছেন। 
১৯৭৩ থেকে ১৯৭৫ সাল পর্যন্ত তানজানিয়ার দারুস সালাম ইউনিভার্সিটিতে উদ্ভিদবিজ্ঞান বিভাগে ‘ভিজিটিং প্রফেসর’ ছিলাম। জেনেটিকসের ক্লাস নিতে হতো, গবেষণা করতে হতো। ক্লাসই বেশি নিতে হয়েছে। ওখানে কোনো ছাত্র-ছাত্রী কখনোই নকল করে না। যে দু-চারজনকে নকল করতে দেখেছি, তারা ভারতীয় বংশোদ্ভূত। তানজানিয়ার আরেকটি অবিশ্বাস্য ব্যাপার হলো—দারুস সালাম বিশ্ববিদ্যালয়ের উদ্ভিদবিজ্ঞান বিভাগ বৃক্ষ বা কোনো কিছু নিয়ে গবেষণার জন্য এমনকি বিমানও ব্যবহার করত। দেশটি খুব বেশি উন্নত না হলেও গবেষণা ও প্রকাশনার পেছনে তারা খরচ করে। ‘সেরেনগেটি’ নামের বিখ্যাত গেম পার্কেও গিয়েছি। বাঘ-সিংহ বনের পরিবেশে ঘুরে বেড়ায় বলে গাড়ি থেকে দর্শনার্থীদের নামতে দেওয়া হয় না। বনে সিংহ, গাছের ওপর চিতাবাঘ বিশ্রাম নিচ্ছে—এমন দৃশ্য দেখেছি। ষড়যন্ত্র সব জায়গায়ই হয়। এক ভারতীয় আমাকে চিঠি লিখেছিল যে আপনি তো ওখানে আছেন। যদি কোনো পদ খালি থাকে আমার জন্য চাকরির বন্দোবস্ত করে দিলে বড় ভালো হয়। তাকে চাকরি দিয়ে নিয়ে এলাম। কিন্তু সে আসার পর পেছনে লেগে গেল। শেষ পর্যন্ত আমাকেই চাকরি ছাড়তে হলো। 

এরপর তো নাইরোবি বিশ্ববিদ্যালয়ে যোগ দিলেন?
কেনিয়ার এই বিশ্ববিদ্যালয়টি দারুস সালাম বিশ্ববিদ্যালয় থেকে আরেকটু উন্নত। সেখানেও দুই বছর ভিজিটিং প্রফেসর ছিলাম। কয়েকটি বিষয় সেখানে চালু করেছিলাম। যেমন আমি ক্লাসে পড়ানো বিষয়ের ওপর প্রশ্নপত্র তৈরি করে দিতাম। ছাত্র-ছাত্রীরা উত্তর লিখে একজন আরেকজনের খাতা মূল্যায়ন করত। উত্তরগুলো বোর্ডে লিখে দিতাম। এটি তারা খুব পছন্দ করেছিল। সেখানেও বনবাদাড়ে ঘুরে বেড়াতাম। 

‘ঢাকা ইউনিভার্সিটি স্টাডিজ’-এর সম্পাদক ছিলেন। 
আগে আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের মধ্যে গবেষণা প্রবন্ধ প্রকাশের তেমন চর্চা ছিল না। তখন ‘ঢাকা ইউনিভার্সিটি স্টাডিজ’ নামের একটি জার্নাল বেরোত। যেকোনো বড় জার্নালে কোনো গবেষণা প্রবন্ধ প্রকাশের জন্য পাঠালে দুজন বিশেষজ্ঞ সেটি পড়ে ছাপার যোগ্য কি না মতামত দেন। তাঁদের মূল্যায়নের ভিত্তিতেই সেটি ছাপা হয়। তবে ঢাকা ইউনিভার্সিটি স্টাডিজে এসবের কোনো বালাই ছিল না। যে কেউ লেখা পাঠালেই ছাপা হয়ে যেত। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের তত্কালীন অধ্যাপক মোজাফফর আহমদ চৌধুরী, যাঁকে ‘ম্যাক’ নামে সবাই চেনেন, আমি যোগদানের পর তিনি ডেকে বললেন, ‘আমি জেনেছি, তুমি একজন ভালো সম্পাদক। আমাদের ঢাকা ইউনিভার্সিটি স্টাডিজের অবস্থা ভালো নয়। তুমি এর সম্পাদনার ভার নাও। ’ সম্পাদনার দায়িত্ব নিয়ে নিয়ম করলাম—প্রতিটি প্রবন্ধ বিশেষজ্ঞ দ্বারা মূল্যায়নের পর ছাপা হবে। এর পর থেকে সেটির মান ভালো হতে লাগল। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সবগুলো জার্নালে এখন আমার চালু করা নিয়মে লেখা প্রকাশিত হয়। 

গবেষণাজীবন?
এ ক্ষেত্রে পাটের কথা বলতেই হয়। কারণ এ বিষয়ের ওপর গবেষণা করেই জীবনের বেশির ভাগ সময় কাটিয়েছি। পাটের দুটি জাত আছে—একটিকে ‘দেশি’, আরেকটিকে ‘তোষা’ পাট বলে। দেশি জাতের মধ্যে যে গুণ আছে, সেগুলো তোষার মধ্যে নেই। ফলে দুই জাতের মধ্যেই সমান গুণাবলি নিয়ে আসতে দুটিকে সংকরায়ণ করতে হবে। আমার আগে ১৯০৯ সালে দুইজন ব্রিটিশ গবেষক সংকরায়ণের চেষ্টা করলেও সফল হননি। আমার গবেষণায় দেখা গেল, তারা জেনেটিক্যালি এত আলোদা যে সংকরায়ণ করলেও হয় না। তখন নতুন পদ্ধতির মাধ্যমে হাইব্রিড করলাম। একে বলে ‘অ্যামব্রিও কালচার’। আমরা অণুবীক্ষণ যন্ত্রে দেখলাম, এই ভ্রূণ দু-একদিন পর নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। ফলে বীজ থেকে কৌশলে ভ্রূণকে বের করে এনে ক্যালসিয়াম, ম্যাগনেশিয়াম ইত্যাদি ভিটামিনের মাধ্যমে তাজা করলাম। এরপর সেটি আমরা বড় করলাম। দুটি প্রজাতির সংকরায়ণ নিয়ে প্রথম লেখাটি ১৯৬০ সালে এবং পরেরটি ১৯৬৪ সালে নেচারে প্রকাশিত হয়েছে। এরপর পাট গবেষকদের বিরাট একটি আর্টিকেল নেচারে বেরিয়েছিল। সেটি অনেক গবেষক মিলে লিখেছিলেন। পাটে আমার অনেক কাজ আছে। সে জন্য তাঁরা সেই লেখাটি আমাকে উত্সর্গ করেছিলেন। বিখ্যাত বংশগতিবিদ মাকসুদুল আলম আমার গবেষণা থেকেই তাঁর গবেষণার সূত্র পেয়েছিলেন। এরপর তিনি পাটের জিনতত্ত্ব আবিস্কার করেন। সায়েন্স ম্যাগাজিনে পাটের ওপর আমার এক পিএইচডির ছাত্রীর গবেষণার সারসংক্ষেপ যৌথভাবে ১৯৭০ সালে প্রকাশিত হয়েছে। দেশ-বিদেশের বিভিন্ন জার্নালে আমার শতাধিক গবেষণা প্রবন্ধ প্রকাশিত হয়েছে। এছাড়াও ১৯৫০ সালে সিলেটের একটি ঘন জঙ্গলে আমি ‘অ্যালসোফিলা গ্যালব্রা’ নামের একটি ফার্ন আবিষ্কার করেছি। নারায়ণগঞ্জের জঙ্গল থেকেও আরেকটি ফার্ন আবিস্কার করেছিলাম। 

১৯৯০ সালে আমেরিকায় গবেষণা করতে গিয়েছেন। 
প্রায় ১৮ বছর ইউনিভার্সিটি অব টেক্সাসের অস্টিন ক্যাম্পাসে মলিকুলার বায়োলজির ওপর গবেষণা করেছি। সেখানে আমাকে পাটের ডিএনএ, আরএনএ বের করতে হয়েছে। এরপর সিকোয়েন্স বের করতে হয়েছে। সেগুলো কিভাবে সজ্জিত ও বিন্যস্ত থাকে, সেসব নিয়ে গবেষণা করেছি। সে জন্য উন্নতমানের যন্ত্রপাতির প্রয়োজন হয়। সেগুলো তো আমাদের দেশে নেই। অস্টিনের গবেষণাগারে ছিল। আমার সেসব গবেষণার ফলাফল বিভিন্ন জার্নালে প্রকাশিত হয়েছে। অস্টিনে বাড়িও কিনেছিলাম। ২০০০ সালে যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিকত্ব নিয়েছিলাম। তবে স্ত্রী হোমায়রা ইসলামের মৃত্যুর পর আর বিদেশে থাকিনি। দেশে চলে এসেছি। 

‘ফান্ডামেন্টাল অব জেনেটিকস’ নামে আপনার লেখা পাঠ্যপুস্তক আছে। 
১৯৭০ সালে এটি প্রথমে ইংরেজিতে লিখেছিলাম। পরে বাংলায় লিখলাম। নাম দিলাম—‘বংশগতিবিদ্যার মূলকথা ও জিন প্রকৌশল’। এটি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে উদ্ভিদবিজ্ঞান বিভাগে প্রথম বর্ষের পাঠ্যপুস্তক ছিল। তবে প্রথম বর্ষে শেষ করতে পারত না বলে পরেও পড়ানো হতো। এটি দিয়ে তাদের পুরো এমএসসির সিলেবাস কভার করত। এখন তা নতুন আঙ্গিকে লেখা হয়েছে। সেখানে আমার সঙ্গে আরো তিনজন সহ-লেখক আছেন। 

শ্রুতলিখন : সাইদ হাসান রাজ
(২২ আগস্ট ২০১৭, গুলশান-২, ঢাকা


Recent News

Calendar

February 2017
Su Mo Tu We Th Fr Sa
29 30 31 1 2 3 4
5 6 7 8 9 10 11
12 13 14 15 16 17 18
19 20 21 22 23 24 25
26 27 28 29 1 2 3